05/05/2025
মহারাজা তোমারে সেলাম......
আগেই বলেছি আমাদের ডেরা ছিল জয়সলমিরে। মুকুলের সোনার কেল্লা থেকে আধ মাইল দূরে একটি ছোটোখাটো প্রাসাদের মত গেস্ট হাউসে আমাদের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জনের থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। পরদিন ভোরে উঠে আমারা প্রথমে গেলাম কেল্লার ভিতরে শ্যুটিং করতে । ঘন্টা তিনেক ধরে সেখানে ছবির শেষ দৃশ্যের কিছু শট নেওয়া হল। তারপর তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা আড়াইটার মধ্যে গিয়ে হাজির হলাম উটের শুটিং এর জায়গায়। গিয়ে দেখি উটের দল আগেই হাজির। এবার শুধু ট্রেন আসার অপেক্ষা । গতকালের গণ্ডগোলটাও যে শাপে বর হয়েছে সেটা বুঝলাম আকাশের চেহারা দেখে। সাদা আর ছাই রঙের টুকরো টুকরো মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে। তারই ফাঁক দিয়ে ফাঁক দিয়ে সোনালি রোদ এসে পড়েছে মরুভূমির উপর। নাটকীয় দৃশ্যের পক্ষে এমন মানানসই নাটকীয় আলো গতকাল ছিল না। আজ ট্রেন ও হাজির হল ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় । আসের আগের মুহুর্ত পর্যন্ত সকলের ই বুক ধুকপুক ধুকপুক করছিল , কারণ কাল সকালেই জয়সলমির ছেড়ে চলে যেতে হবে যোধপুর, আর কালই সন্ধ্যায় আমরা তল্পি -তল্পা গুটিয়ে রাজস্থান ছেড়ে ঘরমুখো রওনা হবো । হটাৎ যখন কানে এলো ঝুক ঝুক শব্দ , তখন সবাই একসঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম।ট্রেন এসে থামবার পর ড্রাইভার কে সব ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেওয়া হল। তাকে পিছিয়ে যেতে হবে সিকি মাইল। সেখান থেকে আবার রওনা হয়ে ট্রেন আমাদের দিকে এগিয়ে আসবে , সময় বুঝে আমরা সওয়ার সমেত উটের দল কে রওনা করিয়ে দেব। ক্যামেরা থাকবে হুড খোলা জিপের উপর, পিচের রাস্তা দিয়ে জিপ ঠেলে ক্যামেরাকেও উটের সঙ্গে সঙ্গে দৌড় করানো হবে ট্রেনের দিকে।ড্রাইভার কে সবই বোঝানো হয়েছিল, কেবল একটি জিনিস বাদে -যার ফলে আমাদের প্রথম বাজি ভেস্তে গেল। ট্রেন আসছে , উট ছুটছে ; ট্রেন উটের কাছাকাছি এসে গেলে পর ফেলু যেই পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত নেড়েছে , অমনি ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে ট্রেন থেমে গেল। ড্রাইভার কে জিগ্যেস করেতে বলল ‘বাবু যে আমায় থামবার জন্য ইশারা করল তাইতো থামলাম’।ড্রাইভার বেচারা তো আর জানে না যে ও জিনিস টা করলে গল্পের ঘটনা একেবারে উলটিয়ে যায়! পিছোও পিছোও- ট্রেন পিছোও , আবার সেই সিকি মাইল দূরে। উট পিছোও, ফেলু তোপসে লালমোহন পিছোও, জিপ ক্যামেরা সব পিছোও, আবার সব শুরু থেকে নতুন করে হবে। এবারে নিশ্চয় আর কনও গণ্ডগোল হবে না । ট্রেন আবার রওনা হল।ওই যে শব্দ শোনা যাচ্ছে , ওই এসে পড়ল বলে। উটের দল কে ইশারা করে দেওয়া হল। জিপ কে ঠেলার জন্য সার বেঁধে লোক তৈরি। এক ঠেলায় একদফা ঘাম ছুটে গেছে তাদের, এবার দ্বিতীয় দফা। ক্যামেরা চালু করের জন্য স্টার্ট কথাটা বলতে গিয়ে জিভে আটকে গেল। ট্রেন তো আসছে, কিন্তু ধোঁয়া কই ? মরু প্রান্তরের বিশাল ঝলমলে আকাশ ট্রেনের মিশকালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে—এ না হলে দৃশ্য টা জমবে কী করে ? থামাও থামাও , ট্রেন থামাও , উট থামাও, জিপ থামাও। দলের যত লোক যে যার কাজ ফেলে দু হাত তুলে ট্রেনের দিকে ছুটে গেল । রোককে রোককে । ঘ্যাঁ-চ করে ট্রেন আবার ব্রেক কষল। স্টোকারবাবু নিজে শুটিং দেখার জন্য এত উদ্গ্রীব যে বয়লারের কয়লা দিতে ভুলেই গেছেন- ধোঁয়া আর হবে কত্থেকে? এবার কিন্তু কয়লা দেওয়া চাইই চাই। তৃতীয় বার ভুল হলে আমরা পথে বসব, কারণ চার বারের বার আর আলো থাকবে না। স্টোকারেরখেয়াল খুশির উপর নির্ভর না করে এবার ইঞ্জিনে আমাদের নিজেদের একজন লোক রেখে দিলাম। ফেলু , তোপসে আর জটায়ু উটের পিঠে চড়ে জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। বার বার তিন বার শট নেওয়াতে একটা লাভ হবে জানি—সওয়ারদের আর দম বেরোনোর অভিনয় করতে হবে না । জটায়ুর অবস্থা তো দেখছি এর মধ্যেই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি । কিন্তু দৃশ্য টা জাতে ভালভাবে তোলা হয় তা জন্য সবাই সমান ব্যগ্র, তাই পরিশ্রম হলেও কেউ সেটা গায়ে মাখছে না। তিনবারের পর আর কোনও গণ্ডগোল না হওয়াতে দৃশ্যটা নিখুঁত ভাবে তোলা হয়ে গেল।
সত্যজিৎ রায়ের "একেই বলে শুটিং" থেকে নেওয়া।